বাঙালি মাত্রই ইলিশের ভক্ত, সে ভারতের বাঙালি হোক, বাংলাদেশি হোক বা লন্ডন-আমেরিকাতেই থাকুন না কেন। ভাতের পাতে এক পিস ইলিশ পড়লে,আর কিছু লাগে না।
কিন্তু সম্প্রতি কলকাতায় ইলিশ একদমই পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় বাংলাদেশের ইলিশ কলকাতার বাজারে ছেয়ে যেত। সে গুড়েও বালি। বাংলাদেশ থেকেও ইলিশ আসছে না।
এরকম সঙ্কটের মধ্যে দাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় 'পুকুরে ইলিশ' চাষের জন্য উদ্যোগী হয়েছেন। সম্প্রতি এক ক্যাবিনেট মিটিংয়ে ইলিশ না পাওয়ার কথা তিনি নিজে থেকেই তোলেন।
মিটিংয়ে মৎসমন্ত্রী চন্দ্রনাথ(চাদু) সিংহ বলেন, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে 'পুকুরে ইলিশ' প্রকল্প চালু ছিল। ভারত সরকার এই প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা দিয়েছে, রাজ্য সরকারও খরচ করেছে। ব্যারাকপুর মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র ছাড়াও কয়েকটি বেসরকারি হ্যাচারিতে 'পুকুরে ইলিশ' চাষ নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা চলেছিল। কিছুটা সাফল্য মিলেছিল,কিন্তু বাম সরকার এটি বন্ধ করে দেয়।
মমতা পুনরায় এই প্রকল্প চালু করার নির্দেশ দেন। মৎসমন্ত্রী বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর আগ্রহের কারণেই এটি পুনরায় চালু করা হবে। আগের সরকারের আমলে কোন প্রর্যন্ত কাজ হয়েছিল,কোথায় সমস্যা ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাবেক বাম সরকারের মৎসমন্ত্রী কিরণময় নন্দ বলেন, পুকুরে ইলিশ নিয়ে গবেষণা প্রকল্পে দারুন সাফল্য মিলেছিল। হুগলি জেলার মগরায় একটি বেসরকারি হ্যাচারিতে কৃত্তিমভাবে ইলিশ মাছের প্রজনন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। ব্যারাকপুর গবেষণা কেন্দ্রও অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু ইলিশের বাচ্চা মারা যায়।
পশ্চিমবঙ্গের মৎসমন্ত্রীর একান্ত সহকারী অভিজিৎ চক্রবর্তী জানান, রাজ্য সরকারের তরফে পুকুরে ইলিশ নিয়ে একটি গবেষণাগার তৈরে হয়েছে ডায়মন্ড হারবারের সুলতানপুরে সাগরের ধারে। মৎস অধিদফতরের এক উপ সচিব ড.সপ্তর্ষি বসুর তত্ত্বাবধানে একদল গবেষককে নিযুক্ত করা হয়েছে। তারা এই কাজ চালু করার পথে। এটি এখন শুধু সময় সাপেক্ষ গবেষণা।
মগরার ওই বেসরকারি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান কর্মকর্তা শ্যামাচরন দে বলেন, “১৯৮৪ সাল থেকে প্রায় ২০ বছর আমরা কৃত্তিমভাবে ইলিশের ব্রিডিংএর কাজ করেছিলাম। আমরা গঙ্গা থেকে জল সমেত ইলিশ ধরে নিয়ে আসতাম। হ্যাচারিতে কৃত্তিম জলের স্রোত তৈরি করেছিলাম, লবনাক্ত জল বানানো হয়েছিল, জলের তাপমাত্রা ঠিক রাখা হতো।”
ব্যারাকপুর গবেষণা কেন্দ্রের এক গবেষক জানান, সমুদ্রের অনেক মাছই বিভিন্ন দেশে কৃত্তিম প্রজনন ঘটানো সম্ভব হয়েছে। মিসরের নীল নদের মাছ নাইলোটিকা নিয়ে এসে এখানে প্রজনন সফল হয়েছে,জাপানে সমুদ্রের বেশ কয়েকটি মাছ সেখানের বিজ্ঞানীরা সফল প্রজনন করিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে লোনা পানির বাগদা চিংড়ি ও ভেটকি এখন পুকুরে চাষ হচ্ছে সফলভাবে।
পুকুরে ইলিশ নিয়ে তাই একদিন এই গবেষণা সফল হবে,এটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারণা। সেজন্য সরকারি ও বেসরকারি স্তরে পুকুরে ইলিশ প্রকল্পকে তিনি উৎসাহ দিচ্ছেন।
বিশ্বে যা ইলিশ পাওয়া তার ৭০ ভাগ বাংলাদেশে, ভারতে ১৫ ভাগ,মিয়ানমারে ১০-১২ ভাগ। আর ২-৫ ভাগ বিভিন্ন দেশে। মাঝে মিয়ানমারের ইলিশ আসছিল কলকাতায়,সেটিরও আমদানি কমে গিয়েছে। ইলিশ নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে শুধু বাংলাদেশে। কিন্তু তা এপারে আসার জো নেই।
তাই,পুকুরে ইলিশ হবে ,এই আশায় বুক বেধে আছে এই বাংলার ইলিশ প্রেমি বাঙালি। দেখা যাক বিজ্ঞানীরা কতদূর আশার আলো দেখাতে পারেন।

No comments:
Post a Comment